ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে অনিয়মের অভিযোগে হাইকোর্টের নির্দেশ: ৩০ জুনের অভিযোগ ২৬ অক্টোবরের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ, আইডিআরএকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
স্টাফ রিপোর্টার:
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, কর্পোরেট সুশাসন লঙ্ঘন, পরিবারতন্ত্র, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোম্পানি ও বীমা আইন ভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন। আদালত বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-কে আবেদনকারীদের ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে দাখিল করা অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে আদালতে হলফনামার মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি ম্যাটার নং-৭১৮/২০২৬ মামলায় ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে মাননীয় বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, আবেদনকারীদের সম্পূরক হলফনামা মূল আবেদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে আদালত আবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ (Admit) না করে প্রতিপক্ষদের প্রতি কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ জারি করেছেন, যাতে তারা ব্যাখ্যা দেন কেন আবেদনটি গ্রহণ করা হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনায় আদালত আইডিআরএকে (মামলার প্রতিপক্ষ নং-৩) আবেদনকারীদের ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে দাখিল করা প্রতিনিধিপত্রে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের মধ্যে নিষ্পত্তি করে আদালতে একটি হলফনামার মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি আবেদনকারীদের বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে আইডিআরএর কাছে আদালতের নোটিশ পৌঁছে দেওয়া এবং সকল প্রতিপক্ষকে আদেশের কপি যথাযথভাবে তামিল করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মামলাটি পরবর্তী আদেশের জন্য ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের উদ্যোক্তা পরিচালক (Sponsor Director) জি. বি. হোসেন আইডিআরএর চেয়ারম্যানের কাছে একটি বিস্তারিত আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা পরিচালক ও ৮ লাখ ২৩ হাজার সাধারণ শেয়ারের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অভিযোগ করেন যে, ২০১২ সাল থেকে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে ধারাবাহিকভাবে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে আসছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, তৎকালীন চেয়ারম্যানকে অপসারণের পর দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ নির্বাচন ছাড়াই একই নেতৃত্ব পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, কোম্পানির একাধিক উদ্যোক্তা পরিচালককে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বোর্ড থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
এছাড়া বীমা আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার পরিপন্থীভাবে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে পরিচালক নিয়োগ, অতিরিক্ত শেয়ার ধারণ, পরিচালনা পর্ষদে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, কোম্পানির তহবিলের অপব্যবহার, ভুয়া বোর্ড সভা ও মিটিং ফি গ্রহণ, কর্পোরেট গভর্নেন্স লঙ্ঘন, স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest), আর্থিক বিবরণীতে অনিয়ম এবং শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শরিয়াহ কাউন্সিলের কার্যক্রম উপেক্ষার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
আবেদনকারী আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান চেয়ারম্যান একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে আত্মগোপনে থাকলেও বিদেশ থেকে ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং দূরবর্তী স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিভিন্ন চিঠিপত্র জারি করা হচ্ছে, যার বৈধতা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইডিআরএর কাছে আবেদনকারী চারটি প্রধান প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, অপসারিত উদ্যোক্তা পরিচালকদের পুনর্বহাল, অভিযোগ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির আর্থিক কার্যক্রমের ফরেনসিক অডিট ও প্রয়োজনীয় তদন্ত।
হাইকোর্টের সাম্প্রতিক আদেশের ফলে বিষয়টি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও সিদ্ধান্তের পর্যায়ে এসেছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা আইডিআরএর আইনগত দায়িত্ব।
কর্পোরেট সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড নয়, দেশের সামগ্রিক বীমা খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে।
উল্লেখ্য, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। তাই আবেদনপত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আদালত এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। অভিযোগগুলো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ আইন অনুযায়ী নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
আবেদনকারীদের পক্ষে নিয়োজিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী তনয় কুমার সাহার নিকট এই বিষয়ে ফোন করলে তেমন কিছু বলতে চাননি। তবে এটা জানিয়েছেন যে, তিনি মনে প্রাণে চান বীমা শিল্পে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হোক।
























