শেরপুরের পাহাড়-বনের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক
- আপডেট সময় : ০৩:০৯:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
গোধূলির আলো নিভে এলে গারো পাহাড় যেন রূপ নেয় অন্য এক জগতে। শাল-গজারির বনের ফাঁক গলে চাঁদের আলো নেমে আসে পাহাড়ি টিলায়। সীমান্তপথে ভেসে আসে ঝিঁঝি পোকার ডাক। প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য উপভোগের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও আবাসন সংকটের কারণে তা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না ভ্রমণপিপাসুরা। সন্ধ্যার আগেই তাঁদের ফিরতে হচ্ছে। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে রয়েছে মধুটিলা ইকোপার্ক, পানিহাটা-তাড়ানিসহ বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ও এখান থেকে দেখা যায়। পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও নৈসর্গিক পরিবেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তবে পর্যটকদের রাত্রীযাপনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এক দিনের মধ্যেই ভ্রমণ শেষ করে ফিরে যেতে হয় তাঁদের। তিন দশকেও পর্যটন অবকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবাসনসহ আনুষাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে না ওঠায় প্রায় তিন দশকেও শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ইকোপার্ক পর্যটনকেন্দ্র কাঙ্ক্ষিতভাবে সমৃদ্ধ হয়নি। খাবার, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা আগের তুলনায় ভালো হলেও জেলা শহরের বাইরে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা নেই। নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের যাতায়াত থাকলেও সেখানেও পর্যটক ও যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত রাত্রীযাপনের ব্যবস্থা নেই। ফলে সীমান্ত এলাকায় ঘুরতে আসা মানুষকে দিনের মধ্যেই ভ্রমণ শেষ করে ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মধুটিলা ইকোপার্ক বন বিভাগের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে নালিতাবাড়ী সীমান্তে মধুটিলা ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় ৩৯০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই ইকোপার্কে রয়েছে পাহাড়ি বন, লেক, ওয়াচ টাওয়ারসহ পর্যটকদের বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা। মধুটিলা ইকোপার্ক ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো শেরপুরকে পর্যটন মানচিত্রে পরিচিত করে তুলেছে। দিনের বেলায় এসব স্থানে পর্যটকদের ভিড় দেখা গেলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মধুটিলায় আধুনিক রিসোর্ট, আবাসিক ব্যবস্থা কিংবা পর্যাপ্ত বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পর্যটকদের দীর্ঘ সময় অবস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে সন্ধ্যা নামার আগেই অধিকাংশ দর্শনার্থী ফিরে যান। এক দিনে সব দর্শনীয় স্থান ঘোরা সম্ভব নয় সীমান্ত সড়ক ধরে পর্যটকেরা মধুটিলা ইকোপার্কের পাশাপাশি বারোমারী মিশন,পানিহাতা,তারানি, সুতানালী দীঘি, নাকুগাঁও স্থলবন্দরসহ আশপাশের আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। কিন্তু এতগুলো স্থান এক দিনে ঘুরে দেখা প্রায় অসম্ভব। পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা থাকলে পর্যটকেরা অন্তত দুই-তিন দিন অবস্থান করে এসব দর্শনীয় স্থান উপভোগ করতে পারতেন। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মধুটিলা ইকোপার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করীম বলেন, ‘পর্যটকেরা দিনের বেলা ভিড় করেন, কিন্তু রাতে থাকতে পারেন না। আবাসিক সুবিধা হলে পর্যটন অনেক এগিয়ে যেত।’ আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি সীমান্তঘেঁষা নালিতাবাড়ী উপজেলায় আধুনিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট বা মোটেলের সংখ্যা খুবই সীমিত। নাকুগাঁও স্থলবন্দরেও নেই পর্যাপ্ত অতিথিশালা বা রাত্রীযাপনের ব্যবস্থা। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাজধানীর মিরপুর থেকে সপরিবারে ঘুরতে আসা গৃহিণী লায়লা আফরোজ বলেন, ‘আমরা নালিতাবাড়ী এসেছি গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। দিনের বেলায় সব জায়গা ঘুরে দেখাটা সুন্দর অভিজ্ঞতা ছিল। তবে রাতে থাকার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ফিরে যেতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এখানে ভালো রিসোর্ট বা আবাসিক হোটেল থাকলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আরও এক-দুই দিন অবস্থান করা সম্ভব হতো। পর্যটন পুলিশ মোতায়েনের দাবি মধুটিলা ও গারো পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েনের দাবি রয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ক্যাম্প থাকলেও পর্যটকদের জন্য বিশেষায়িত নিরাপত্তাব্যবস্থা চান স্থানীয় মানুষ ও দর্শনার্থীরা। স্থানীয়দের মতে, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নিরাপদ ও আধুনিক আবাসিক ব্যবস্থা, পর্যটন অবকাঠামো এবং বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো গেলে গারো পাহাড়কে ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ও বাড়বে। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ময়মনসিংহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নালিতাবাড়ী মধুটিলা ইকোপার্ক পর্যটন কেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তায় নালিতাবাড়ী থানার পুলিশ নিয়মিত টহল দেয় এবং গ্রাম পুলিশও মোতায়েন রয়েছে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। সম্ভাবনার হাতছানি পাহাড়, বন, লেক, সীমান্তের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ও গারো পাহাড় হতে পারে শেরপুরের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ আবাসন, পর্যটনবান্ধব পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। পর্যটকদের প্রত্যাশা—শুধু দিনের সৌন্দর্য নয়, একদিন গারো পাহাড়ের নীরব রাতের সৌন্দর্যও যেন তাঁরা নিরাপদে উপভোগ করতে পারেন।



















