জাপানে প্রথমবারের মতো নিজ ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
- আপডেট সময় : ০১:১৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫ ৬৯ বার পড়া হয়েছে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন সামরিক সমীকরণের ইঙ্গিত
বহু দশক ধরে ‘শান্তির প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত জাপান এবার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে নিজ ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ জুন) এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় হোক্কাইডো দ্বীপে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন বার্তাসংস্থা এপি, যা বুধবার (২৫ জুন) এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়।
জাপান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পরীক্ষার লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যাচাই ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা। পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয় ‘টাইপ-৮৮ সারফেস-টু-শিপ’ নামের স্বল্প-পাল্লার একটি মিসাইল, যা ট্রাক-মাউন্টেড লঞ্চার থেকে ছোড়া হয়। হোক্কাইডোর শিজুনাই অ্যান্টি এয়ার ফায়ারিং রেঞ্জ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার (২৪ মাইল) দূরে একটি ক্রুবিহীন জাহাজকে লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়।
চীনের হুমকি মোকাবেলায় কৌশল বদল
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষাটি ছিল শুধু একটি টেস্ট ফায়ার নয়—বরং চীনের সামরিক বিস্তার এবং দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার জবাব হিসেবেও বিবেচিত। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তিবাদী সংবিধান অনুসরণ করা জাপান এখন ধীরে ধীরে একটি সক্রিয় সামরিক নীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাপান ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা আগামী সপ্তাহেও আরও একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করবে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে যে, দেশটি তার নিরাপত্তা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
২০২২ সালে জাপান সরকার নতুন একটি পাঁচ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করে। যার আওতায় সামরিক ব্যয় দ্বিগুণ করা, দূরপাল্লার আক্রমণ সক্ষমতা অর্জন এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য—প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব প্রতিহত করা।
মার্কিন সহায়তা ও সমরাস্ত্র আধুনিকায়ন
জাপান-মার্কিন প্রতিরক্ষা জোট আরও জোরদার হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। চলতি বছরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ‘টমাহক’ ক্রুজ মিসাইল মোতায়েন শুরু করবে জাপান। এ ছাড়াও দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করছে ‘টাইপ-১২’ নামক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার—টাইপ-৮৮ এর তুলনায় ১০ গুণ বেশি।
মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মোতায়েনের জন্য জাপান পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের জনবসতিহীন মিনামিটোরিশিমা দ্বীপে একটি নতুন ফায়ারিং রেঞ্জ নির্মাণের পরিকল্পনাও নিয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যেই চীনা বিমানবাহী রণতরীগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি নজরে এসেছে, যা এই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা ভারসাম্যের পরিবর্তন
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই পদক্ষেপ শুধু চীন নয়, বরং গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্য বদলে দেবে। শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে সক্রিয় সামরিক ভূমিকায় রূপান্তরিত হওয়া জাপানের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হলেও, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সংকটজনক অধ্যায়ের শুরুও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জাপান যদি এই পথে অগ্রসর হতে থাকে, তাহলে চীন, উত্তর কোরিয়া এবং এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হতে পারে। অন্যদিকে, জাপানের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক জোটগুলো।
উপসংহার:
জাপানের নিজ ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কেবল একটি সামরিক মহড়া নয়—বরং এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট বার্তা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণ গড়ে উঠছে, জাপান সেখানে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। এই অঞ্চলে আসন্ন দিনগুলোতে রাজনৈতিক কূটনীতি, প্রতিরক্ষা জোট ও সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।
















