সর্বশেষ
গাইবান্ধায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী, কিশোরদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ সাপাহারে বিএনপির মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত চাটখিলে মাদকের ভয়াল থাবা: শতাধিক স্পটে মাদক ও জুয়ার আসর, ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ বেনাপোল দৌলতপুর সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অভিযানে ৬০ বোতল ভারতীয় উইনিক্স সিরাপ উদ্ধার এমপিদের সন্তানদের স্থানীয় স্কুলে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা উচিত — রুমিন ফারহানা, নালিতাবাড়ীতে টয়লেটে মিলল নিখোঁজ শিশুর মরদেহ, আটক ৩ নালিতাবাড়ীতে টয়লেট থেকে নিখোঁজ কন্যাশিশুর মরদেহ উদ্ধার, অভিযুক্ত যুবকের বাবা-মা-বোন আটক নেত্রকোণা জেলা ছাত্রদলের নব কমিটির সদস্য সাখাওয়াত হোসেন তালুকদার সজিব সাপাহার বাজারে আরসিসি সড়ক নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে ১,০০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার -০১

চাটখিলে মাদকের ভয়াল থাবা: শতাধিক স্পটে মাদক ও জুয়ার আসর, ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

চাটখিল প্রতিনিধি | ইমরান
  • আপডেট সময় : ১২:১০:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

নোয়াখালীর উপজেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাদক ও জুয়ার বিস্তার। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক মাদকের আখড়া। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি “এম.ই.ও” নামে থাইল্যান্ডি এক ধরনের জুয়া এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এতে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেকার যুবকরা ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টিরও বেশি স্থানে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে চলছে মাদক বিক্রি ও সেবন। পৌর মার্কেটের গ্রাউন্ড ফ্লোর, মাছ ও মাংস বাজার সংলগ্ন এলাকা, খোকন ভিডিও গলি, সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে, বটতলা, বদলকোট, পাল্লা রোড, থানা সংলগ্ন চায়ের দোকান, ভিমপুর রোডের শিশু কিশোর হাসপাতালের পেছন, বেদে পল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে মাদকের স্পট। এছাড়াও শাহপুর, শ্যামপুর, শংকরপুর, খিলপাড়া, শিবপুর, শ্রীপুর, দেলিয়াই ও বালিয়াধর এলাকাসহ শতাধিক স্থানে নিয়মিত মাদকের কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, চাটখিলে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ জন সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ জন বড় পাইকার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক এনে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাজারজাত করছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলকে “ম্যানেজ” করেই এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে গ্রেফতার করা হলেও সামান্য পরিমাণ মাদক উদ্ধারের কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে “এম.ই.ও” নামের জুয়ার ভয়াবহ বিস্তার এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। অটোরিকশা চালক, রিকশাচালক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ সারাদিনের কষ্টার্জিত আয় সন্ধ্যায় জুয়ার বোর্ডে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরছেন। এতে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিবারে বাড়ছে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, অর্থ সংকট ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা।
ভুক্তভোগী অটোরিকশা চালক জহির উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী সারাদিন গাড়ি চালিয়ে যা আয় করে, সন্ধ্যায় জুয়া খেলে সব শেষ করে ফেলে। অনেক সময় আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়।”
অপরদিকে শাহপুর বাজারের বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, “আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এখন প্রতিদিন টাকার জন্য বাসায় ঝগড়া করে, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে।”
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট বলেন, “মাদক ব্যবসা ও সেবন এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
চাটখিল থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, “মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং প্রতি মাসে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মামলার অগ্রগতি উপস্থাপন করা হয়।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল ও জরিমানা করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।”
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে নয়, মাদকের গডফাদার ও জুয়ার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চাটখিলকে এই ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

চাটখিলে মাদকের ভয়াল থাবা: শতাধিক স্পটে মাদক ও জুয়ার আসর, ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

আপডেট সময় : ১২:১০:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

নোয়াখালীর উপজেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাদক ও জুয়ার বিস্তার। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক মাদকের আখড়া। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি “এম.ই.ও” নামে থাইল্যান্ডি এক ধরনের জুয়া এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এতে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেকার যুবকরা ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টিরও বেশি স্থানে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে চলছে মাদক বিক্রি ও সেবন। পৌর মার্কেটের গ্রাউন্ড ফ্লোর, মাছ ও মাংস বাজার সংলগ্ন এলাকা, খোকন ভিডিও গলি, সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে, বটতলা, বদলকোট, পাল্লা রোড, থানা সংলগ্ন চায়ের দোকান, ভিমপুর রোডের শিশু কিশোর হাসপাতালের পেছন, বেদে পল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে মাদকের স্পট। এছাড়াও শাহপুর, শ্যামপুর, শংকরপুর, খিলপাড়া, শিবপুর, শ্রীপুর, দেলিয়াই ও বালিয়াধর এলাকাসহ শতাধিক স্থানে নিয়মিত মাদকের কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, চাটখিলে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ জন সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ জন বড় পাইকার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক এনে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাজারজাত করছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলকে “ম্যানেজ” করেই এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে গ্রেফতার করা হলেও সামান্য পরিমাণ মাদক উদ্ধারের কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে “এম.ই.ও” নামের জুয়ার ভয়াবহ বিস্তার এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। অটোরিকশা চালক, রিকশাচালক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ সারাদিনের কষ্টার্জিত আয় সন্ধ্যায় জুয়ার বোর্ডে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরছেন। এতে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিবারে বাড়ছে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, অর্থ সংকট ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা।
ভুক্তভোগী অটোরিকশা চালক জহির উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী সারাদিন গাড়ি চালিয়ে যা আয় করে, সন্ধ্যায় জুয়া খেলে সব শেষ করে ফেলে। অনেক সময় আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়।”
অপরদিকে শাহপুর বাজারের বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, “আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এখন প্রতিদিন টাকার জন্য বাসায় ঝগড়া করে, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে।”
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট বলেন, “মাদক ব্যবসা ও সেবন এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
চাটখিল থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, “মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং প্রতি মাসে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মামলার অগ্রগতি উপস্থাপন করা হয়।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল ও জরিমানা করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।”
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে নয়, মাদকের গডফাদার ও জুয়ার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চাটখিলকে এই ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।