বীমায় বন্দী মানুষের টাকা-স্থায়ী সমাধানই সময়ের দাবি
- আপডেট সময় : ১১:৪১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
৮২ কোম্পানির কাছে গ্রাহকের ৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, সাত প্রতিষ্ঠানেই আটকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি; সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধের উদ্যোগ।
সন্তানের লেখাপড়া, মেয়ের বিয়ে, নিজের চিকিৎসা কিংবা বার্ধক্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে মানুষ বীমা করেন। মাসের আয় থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমা দেন। সংসারে অভাব এলেও নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন। বিশ্বাস করেন, মেয়াদ শেষে এই অর্থই একদিন বিপদের সময় পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যখন নিজের টাকা ফেরত পাওয়া যায় না, তখন সেই বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় অসহায়তায় পরিণত হয়।
কেউ চিকিৎসার জন্য অর্থের অপেক্ষায় থাকেন। কেউ সন্তানের ভর্তির টাকা জোগাড় করতে পারেন না। কেউ ধার করেন, কেউ জমি বা গয়না বিক্রি করেন। অথচ বীমা কোম্পানির কাছে পড়ে থাকা অর্থটি কোনো অনুদান নয়। এটি তাঁদের নিজের উপার্জন। ভবিষ্যতের জন্য তিল তিল করে গড়ে তোলা সঞ্চয়।
নিজের পাওনা পেতে অনেক গ্রাহককে এক কার্যালয় থেকে আরেক কার্যালয়ে ঘুরতে হয়। কখনো বলা হয়, কাগজে সমস্যা আছে। কখনো অনুমোদন আসেনি। আবার কখনো পরের মাসে টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়, কিন্তু অপেক্ষার শেষ হয় না।
এই যন্ত্রণা এখন আর একজন বা দুটি পরিবারের নয়। দেশের হাজার হাজার গ্রাহকের ভবিষ্যৎ বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে আটকে আছে।
বকেয়া প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে।
এর মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই আটকে আছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বকেয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত।
আইডিআরএর নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বৃহস্পতিবার মতিঝিলে সংস্থাটির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ তথ্য জানান। দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে এটি ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়।
তিনি বলেন, বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সেই আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রথম কাজ হবে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু করা।

বিচ্ছিন্ন নয়, কাঠামোগত সংকট
এত বিপুল পরিমাণ দাবি বকেয়া থাকার ঘটনা কোনো একটি কোম্পানির সাময়িক আর্থিক সমস্যার ফল নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একটি কাঠামোগত সংকট।
একটি বীমা কোম্পানি গ্রাহকের কাছ থেকে যে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে, তার একটি বড় অংশ ভবিষ্যতের দাবি পরিশোধের জন্য নিরাপদ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করার কথা। একই সঙ্গে মেয়াদপূর্তির দাবি মেটানোর মতো নগদ অর্থের ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
কিন্তু অনেক কোম্পানির সম্পদ থাকলেও সময়মতো দাবি পরিশোধ করার মতো নগদ অর্থ নেই। ফলে গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে এখন জমি বিক্রি, স্থায়ী আমানত ভাঙানো এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ নগদায়নের কথা ভাবতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, কোম্পানিগুলোর সম্পদ, আয় ও ভবিষ্যৎ দায়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে রক্ষা করা হয়নি।
দুর্বল কোম্পানির ব্যয়ই বেশি

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, যে কোম্পানি যত দুর্বল, তার পরিচালন ব্যয় তত বেশি। যেসব কোম্পানি ঠিকমতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না, তাদের ব্যয়ও অস্বাভাবিক।
আর্থিক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমিয়ে আনার কথা। কিন্তু কিছু বীমা কোম্পানিতে ঘটেছে তার উল্টো। ব্যবসা কমেছে, দাবি পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, অথচ কার্যালয়, গাড়ি, বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে ব্যয় কমেনি।
এই ব্যয়ের অর্থও শেষ পর্যন্ত এসেছে গ্রাহকের দেওয়া প্রিমিয়াম থেকে। যে অর্থ ভবিষ্যতে গ্রাহকের হাতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, তার একটি অংশ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পেছনে ব্যয় হয়েছে।
পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আগামী এক মাসের মধ্যে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
কমিশনের আড়ালে অর্থ
বীমা খাতের আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা অতিরিক্ত কমিশন। ব্যবসা সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত সীমার বেশি কমিশন দেওয়ার অভিযোগ বহু পুরোনো।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, অনেক ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা বা বিভিন্ন চুক্তির আড়ালে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে এবং কিছু অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত কমিশনে প্রিমিয়ামের বড় অংশ ব্যয় হলে ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানির হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। এতে ব্যবসা বাড়লেও আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
সম্পদের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন



















