ভিসা আছে, ম্যানপাওয়ার নেই: স্বপ্নভঙ্গের নীরব ট্র্যাজেডি
- আপডেট সময় : ১১:৪২:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
rr
“বৈধ ভিসা হাতে পেয়েও ম্যানপাওয়ার বা জনশক্তি ছাড়পত্রের জটিলতায় বিদেশে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না হাজারো বাংলাদেশি। এতে যেমন ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা।”
অনেক সংগ্রাম, ঋণ, জমিজমা বিক্রি কিংবা মায়ের শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রাখার পর যখন একটি পাসপোর্টে কাঙ্ক্ষিত ভিসার সিল পড়ে, তখন মনে হয় জীবনের দীর্ঘ অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে অবশেষে আলোর দেখা মিলেছে। পরিবারে ফিরে আসে স্বস্তির নিঃশ্বাস, বাবা-মায়ের চোখে জেগে ওঠে নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই আজ হাজারো তরুণের কাছে মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে। কারণ, ভিসা পাওয়ার পরও মিলছে না ম্যানপাওয়ার বা জনশক্তি ছাড়পত্র। ফলে বৈধ ভিসা হাতে নিয়েও সময়মতো বিদেশে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না অসংখ্য তরুণ; প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে তাদের অনিশ্চয়তার অপেক্ষা।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই খাতের মূল চালিকাশক্তি—বিদেশগামী কর্মীরাই আজ প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার। ভিসা হাতে নিয়েও তারা নির্ধারিত সময়ে বিদেশে যেতে পারছেন না। দিন গড়াচ্ছে, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, আর এর সঙ্গে সঙ্গে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে একের পর এক পরিবার।
বর্তমান বাস্তবতা যেন এক নির্মম সামাজিক চলচ্চিত্রের জীবন্ত চিত্রনাট্য। সেখানে নায়ক দেশের স্বপ্নবাজ তরুণেরা, আর প্রতিপক্ষ অনিশ্চয়তা, দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে, নিজের ভাগ্য বদলাতে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে বিদেশে যেতে চাওয়া এই তরুণদের স্বপ্ন আজ বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে আটকে আছে।
আজ দেশের বহু তরুণ বৈধ ভিসা হাতে নিয়েও একটি প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের আশায় এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ভিসার মেয়াদ যত কমতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে উদ্বেগ, হতাশা এবং ঋণের বোঝা। অনেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন, কেউ বিক্রি করেছেন জমিজমা, কেউ বন্ধক রেখেছেন পরিবারের শেষ সম্বল। একটি ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া কেবল একটি কাগজের মূল্য হারানো নয়; অনেক সময় সেটিই একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, ত্যাগ, আশা এবং ভবিষ্যৎ একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার নাম।
এই সংকটের প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। দেশ যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন কর্মী রপ্তানির গতি মন্থর হয়ে পড়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। যে খাতটি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেই খাত যদি অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় আটকে থাকে, তবে তার ক্ষতি বহন করতে হয় পুরো দেশকেই।
স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠছে—যদি একজন কর্মীর ভিসা বৈধ হয় এবং গন্তব্য দেশের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা থাকে, তবে তার বিদেশযাত্রা কেন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিলম্বিত হবে? কেন হাজারো তরুণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ, দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়ার অধিকার দেশের সাধারণ মানুষের রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করা নয়; সেই নীতিমালার সুফল যেন সাধারণ মানুষ সহজে ভোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ, দ্রুত, জবাবদিহিমূলক ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, অনিয়ম ও জটিলতা দূর করে বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে উপকৃত হবেন কর্মপ্রত্যাশীরা, তাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং জাতীয় অর্থনীতি।
তরুণদের স্বপ্ন কেবল একটি পরিবারের সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রেরও মূল্যবান সম্পদ। সেই স্বপ্ন যদি বারবার ভেঙে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ।
আজ দেশের হাজারো তরুণ অপেক্ষায় আছেন—কেবল একটি ম্যানপাওয়ার ছাড়পত্রের জন্য নয়, তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও স্বপ্নভঙ্গের এই বেদনা অনেকের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করছে, যা কোনো সমাজের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়।
এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি তাদের এই ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেবে, নাকি এই নীরব ট্র্যাজেডির দর্শক হয়েই থাকবে? সেই উত্তর জানতে চায় পুরো দেশ। কারণ, একটি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া অনেক সময় শুধু একটি কাগজের মেয়াদ শেষ হওয়া নয়; সেটি একটি পরিবারের বহু বছরের ত্যাগ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের ওপর নেমে আসা এক নীরব সমাপ্তির নাম



















