করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় বাড়ানোর চিন্তা, করজাল সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ অর্থনীতিবিদদের
- আপডেট সময় : ০৭:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে নির্ধারিত সীমার সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা যোগ করে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে। একইসঙ্গে আয়করের স্ল্যাব ও করহারেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সাধারণ করদাতা, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন— শুধু করের হার কমানো নয়, বরং কর ব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি করজাল সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় জিডিপির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু বছরের পর বছর করসংক্রান্ত জটিলতা, অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রশাসনিক ঝামেলায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে আয়কর ব্যবস্থার নানা অসংগতি ও জটিলতা ব্যবসা পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
করপোরেট ডিউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুবর্ণা রায় বলেন,
“সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পর্যন্ত ৫ শতাংশ কর ছাড় দেয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও স্বস্তি পাবেন। এতে বিক্রি বাড়বে এবং উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহিত হবেন।”
অন্যদিকে বিডিজেজিপিইএর সভাপতি রাশেদুল করিম মুন্না বলেন,
“সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তবে কর ব্যবস্থার জটিলতা দূর না হলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্বর্তী সরকার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বহাল রেখেছিল। তবে তখনই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে এই সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে।
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার এবার করমুক্ত আয়সীমা এক ধাপেই ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। একইসঙ্গে বর্তমানে প্রচলিত ৭টি করস্ল্যাব কমিয়ে ৬টিতে আনার চিন্তাভাবনাও চলছে। এছাড়া প্রথম করস্ল্যাবে ৫ শতাংশ করহার নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
তবে সাধারণ করদাতাদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। তাই অনেকেই মনে করছেন, অন্তত ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত করা হলে করদাতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হবেন।
একজন করদাতা বলেন,
“সবাইকে করের আওতায় আনা উচিত। তবে কর কর্মকর্তাদের আচরণ আরও সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ হওয়া দরকার।”
আরেকজন করদাতা বলেন,
“সাড়ে ৩ লাখ টাকার সীমা বাড়িয়ে যদি ৫ লাখ টাকা করা হয়, তাহলে নতুন করদাতা বাড়বে। যারা এখন কর দিতে ভয় পান, তারাও আগ্রহী হবেন।”
অর্থনীতিবিদরাও কর ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, করহার বাড়িয়ে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে করজাল সম্প্রসারণ করা উচিত।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন,
“আয়সীমা নির্ধারণে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। এর মধ্যে গত ১৪ মে পর্যন্ত অনলাইনে নিবন্ধন করেছেন প্রায় ৫০ লাখ করদাতা এবং রিটার্ন জমা দিয়েছেন ৪১ লাখ ব্যক্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে কার্যকর ও জনবান্ধব কর সংস্কৃতির বিকল্প নেই। নাগরিকরা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান করেন, তাহলে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। তবে কর ব্যবস্থা যেন সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।



















