“খাল খননের নামে লুটের মহোৎসব!” সদরের পিআইও’র বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারার আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ১২:০২:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়াসহ ৫টি খাল পুনঃখনন প্রকল্প এখন যেন উন্নয়নের নয়, বরং দুর্নীতি আর সরকারি অর্থ লুটপাটের ভয়ংকর উদাহরণে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার এই প্রকল্পে শ্রমিকের ঘাম নয়, চলছে ব্যাকু মেশিনের দাপট। আর সেই দাপটের আড়ালে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে স্থানীয় জনতা।
সরকার যেখানে জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ হরিলুটের অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষায়—“খাল কাটার চেয়ে বেশি কাটা হচ্ছে জনগণের পকেট!”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সদর উপজেলার চরমটুয়া, কালাদরাপ, দাদপুর ও নোয়ান্নই ইউনিয়নের ৫টি খালের প্রায় ২৮ কিলোমিটার পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে কাজ চলছে। গত ৩ মে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।
কাগজে-কলমে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে ৪৩ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। সরেজমিন ঘুরে কোথাও কোনো শ্রমিকের দেখা মেলেনি। দেখা গেছে শুধু ব্যাকু মেশিনের অবাধ ব্যবহার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল খননের নামে চলছে প্রকাশ্য ধ্বংসযজ্ঞ। ব্যাকু মেশিন চলাচলের জন্য খালের দুই পাড়ের শত শত ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে মানুষের বসতঘর, টয়লেট, বাউন্ডারি ওয়ালসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই মাইকিং করে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ও গাছ সরাতে বাধ্য করা হয়েছে।
এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“সরকারি উন্নয়নের কথা বলে আমাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। না সরালে প্রশাসন এসে ভেঙে ফেলবে—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।”
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শ্রমিক নিয়োগ নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের শুরুতে শ্রমিক নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে বহু মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো শ্রমিক কাজে নেই। অভিযোগ রয়েছে, ওয়েজ কস্টের টাকা আত্মসাতের জন্য ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জনপ্রতিনিধি বলেন,
“এই প্রকল্পে যেভাবে কাজ হচ্ছে, তাতে ৭ কোটি টাকার মধ্যে এক কোটি টাকাও প্রকল্পে খরচ হবে না। বাকিটা ভাগবাটোয়ারার পরিকল্পনা চলছে।”
অভিযোগ রয়েছে, খালের স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। খনন করা মাটি সড়কের পাশে না রেখে মানুষের ফসলি জমি ও বাড়ির পাশে ফেলে নতুন বিপদের সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে সড়ক ধস ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে—সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম মিয়াজী। পরে সাংবাদিকরা শ্রমিকের উপস্থিতি, মাস্টাররোল, ব্যাংক হিসাব ও ব্যয়ের তথ্য চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এমনকি প্রকল্পে শ্রমিক খুঁজে না পাওয়ার বিষয়েও কার্যত অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন,
“সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন,
“অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প কি জনগণের কল্যাণে, নাকি দুর্নীতিবাজদের পকেট ভরার উৎসব? জনগণের করের টাকায় নেওয়া প্রকল্প যদি এভাবে লুটপাটের মহাযজ্ঞে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইবে?
এলাকাবাসীর দাবি—দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পে জড়িত দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় উন্নয়নের নামে এই লুটপাট একদিন রাষ্ট্রের জন্যই ভয়ংকর বার্তা হয়ে দাঁড়াবে।



















