চকবাজার-বেগমবাজারের ‘সুদি খোকন’ জামাল উদ্দিন,ব্যবসা নেই, তবু অর্থের লেনদেন? সুদের কারবারে মানুষ নিঃস্ব হওয়ার অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০২:৫৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
ঢাকার চকবাজার-বেগমবাজার এলাকায় একসময় একটি ব্যবসায়ী সমিতিতে স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন জামাল উদ্দিন ওরফে ‘সুদি খোকন’। বর্তমানে তিনি কোনো দৃশ্যমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকলেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে অর্থের লেনদেন এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে সুদের কারবার পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনের সময় অর্থ নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধ করতে না পারলে মূল অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থের বোঝা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন এভাবে অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে কেউ কেউ আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। এমনকি কয়েকজন ব্যবসায়ী দোকান, সম্পদ কিংবা ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা হারানোর পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি, ব্যাংক হিসাব, চেক, রসিদ, চুক্তিপত্র ও সরকারি রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যবসা নেই, তাহলে অর্থের কারবার কীভাবে?
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামাল উদ্দিন বর্তমানে কোনো প্রকাশ্য ব্যবসা পরিচালনা করছেন না। অথচ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তিকে অর্থ দেওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময় পর মূল অর্থের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সময়মতো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মূল অর্থ ও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে ঋণগ্রহীতারা আর্থিক চাপে পড়েন।
কয়েকজনের দাবি, এমন লেনদেনের কারণে তারা ব্যবসা ও সম্পদ হারানোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
দোকানে বসে লেনদেনের আলোচনা, পরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে জামাল উদ্দিনকে দোকানে বসে অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত আলোচনা করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের পরিমাণ, ফেরতের সময়সীমা এবং অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্ত নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মূল অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, ব্যাংক লেনদেন, চেক, রসিদ কিংবা অন্যান্য আর্থিক নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের ভাষায় ‘নীরব ঘাতক’, ‘বোবা ডাকাত’
জামাল উদ্দিনকে ঘিরে চকবাজার-বেগমবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর মধ্যে ক্ষোভ ও নানা অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী তাকে ‘নীরব ঘাতক’ ও ‘বোবা ডাকাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থের চাপে মানুষ ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে ব্যবসা কিংবা সম্পদ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যায়।
এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, “এটা শুধু সুদের কারবার নয়, মনে হয় মানুষের রক্ত চুষে নেওয়ার মতো ব্যবস্থা।”
তবে এটি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত মন্তব্য। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি অনুমোদন বা বৈধতা আছে কি?
অভিযোগকারীদের অন্যতম প্রশ্ন—এ ধরনের অর্থের লেনদেন ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য জামাল উদ্দিনের কোনো সরকারি লাইসেন্স, নিবন্ধন বা বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না।
তাদের দাবি, কোনো প্রকাশ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে নীরবে অর্থের লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের রেকর্ড, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, কর নথি এবং প্রযোজ্য অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
‘সুদি খোকন’ নামের পেছনে অভিযোগের দীর্ঘ ইতিহাস
জামাল উদ্দিনকে ‘সুদি খোকন’ নামে উল্লেখ করে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ প্রতিবেদনে সুদের কারবারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
বেগমবাজারের ব্যবসায়ী সোলেমানের ঘটনাটিও এ আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সোলেমানের বক্তব্যের সূত্র ধরে দাবি করা হয়েছে, সুদের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি দোকান ও বাড়ি হারানোর পরিস্থিতিতে পড়েন।
এ ছাড়া আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী সুদের অর্থের চাপে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
তবে প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, লেনদেনের নথি, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা ছাড়া অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
সুদের কারবারের অভিযোগের পাশাপাশি জামাল উদ্দিনের সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, নোয়াখালীর চৌমুহনী চৌরাস্তা এবং গ্রামের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে তার সম্পদ রয়েছে।
বর্তমানে কোনো দৃশ্যমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না থেকেও এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে—সেটিও অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, জমির দলিল, নামজারি ও অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করলে সম্পদের উৎস এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ছোট ভাই ইকবালকে ঘিরেও নানা অভিযোগ
জামাল উদ্দিনের ছোট ভাই ইকবালকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রতিবেদনে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনে আসক্ত থাকার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে তারা জানান। তবে এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি, মামলা, আদালতের রেকর্ড কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে ইকবালের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে উশৃঙ্খল আচরণ, গালমন্দ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রতিবেদন বা সমালোচনার জবাব তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের জবাব হোক তথ্য-প্রমাণে
জামাল উদ্দিন ওরফে ‘সুদি খোকন’কে ঘিরে সুদের কারবার, ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ, সম্পদের উৎস এবং তার ছোট ভাই ইকবালকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ—সবকিছুই পৃথকভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে।
অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রমাণ পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। একইভাবে কোনো অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে বা অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে।
জামাল উদ্দিন ও ইকবালের বক্তব্যও এ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।



















