সর্বশেষ
ভোলার চরফ্যাশনে ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘মাদক সম্রাট’ নয়ন: রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষা-২০২৬ এর প্যারেড পরীক্ষা অনুষ্ঠিত নালিতাবাড়ীতে দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপহার বিতরণ নালিতাবাড়ী পৌর জামায়াতের ৭ নং ওয়ার্ডের সভাপতি জিহান নোয়াখালীতে প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় রহস্য উর্দঘাটন গ্রেপ্তার ৪ ফুলপুরে ভাইটকান্দি সাদিকা ট্রেডার্সের সংবাদ সম্মেলন: এআই দিয়ে ছবি বিকৃত করে অপপ্রচারের প্রতিবাদ। কুষ্টিয়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গাঁজা ও টাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার-১০ জুড়ীতে গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশু কার্যক্রমের উদ্বোধন বড়লেখা সরকারি ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ শেরপুর জেলাজুড়ে নানা আয়োজনে দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

খাগড়াছড়ির ভালোবাসা: হাতি ‘ফুলকলি’র করুণ অধ্যায়

প্রতিবাদী কণ্ঠ
  • আপডেট সময় : ০৩:৪১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ মে ২০২৫ ২৭৬ বার পড়া হয়েছে

খাগড়াছড়ির ইতিহাসে ‘ফুলকলি’ এক অনন্য নাম। ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর মানবিকতার প্রতীক হয়ে থাকা এই হাতিটির গল্প শুনলে আজও চোখ ভিজে আসে পুরোনো খাগড়াছড়িবাসীর।

এই গল্পের শুরু প্রায় ৭৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের দিকে জন্ম নেওয়া ফুলকলি নামে হাতিটিকে ১৯৬২ সালে খাগড়াছড়ির তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম নিজের বাহন হিসেবে নিয়ে আসেন। সেসময় খাগড়াছড়ি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক প্রত্যন্ত মহকুমা, যেখানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথে চলাচলের একমাত্র নির্ভরতা হয়ে ওঠে ফুলকলি। প্রশাসকের যাতায়াতের বাহন হলেও, খুব অল্প সময়েই সে হয়ে ওঠে পুরো এলাকার মানুষের আপনজন।

গ্রামের মানুষের কাছে ফুলকলি ছিল স্নেহভাজন অতিথি। কেউ তাকে ডেকে আদর করত, কেউ খাওয়াত পাকা কলা, কাঁঠাল, ছোলা, গম আর কলাগাছ। ফুলকলির প্রতি মানুষের ভালোবাসা যেমন ছিল নিঃস্বার্থ, তেমনি ফুলকলিও গড়ে তোলে এক গভীর আত্মিক বন্ধন।

১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরিত হলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও দেখা যায় ফুলকলির সরব উপস্থিতি। সে সময় জেলা প্রশাসকেরা ফুলকলির পিঠে চড়ে বিভিন্ন স্থানে যেতেন। ধীরে ধীরে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ে, আর অবসর নিতে শুরু করে ফুলকলি। তবে রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে শহরের মাঠে অনুষ্ঠিত প্যারেডে ফুলকলি ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—সবাইকে সে অভিবাদন জানাত মাথা নত করে।

পাহাড়ি দুর্ঘটনায় আটকে পড়া যানবাহন উদ্ধারে ফুলকলির অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। খাদে পড়ে যাওয়া গাড়ি টেনে তোলার কাজটা সহজ করে তুলেছিল এই বিশাল প্রাণী। প্রতিদিন তার খাবারের তালিকাও ছিল বিশাল—এক ছড়ি পাকা কলা, পাঁচটি পাকা কাঁঠাল, পাঁচ কেজি ছোলা, পাঁচ কেজি গম, আর প্রতি তিন দিনে এক গাড়ি কলাগাছ।

তবে সব ভালোবাসার গল্পের মতো এ গল্পেরও এক বেদনার অধ্যায় রয়েছে।
একবার পাহাড়ে ঘুরতে গেলে ফুলকলির সামনে আসে একদল বুনো হাতি। তারা ফুলকলিকে দলে নিতে চায়, কিন্তু ফুলকলি যায় না। তার অবাধ্যতায় ক্ষিপ্ত হয়ে বুনো হাতিরা দলবেঁধে আক্রমণ করে। সেই আক্রমণে ফুলকলির বাঁ পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভেটেরিনারি চিকিৎসক আসেন তাকে বাঁচাতে। সে সময় ফুলকলির দেখাশোনায় ছিলেন শশী বিন্দু চাকমা নামের এক নিবেদিতপ্রাণ কম্পাউন্ডার, যিনি আজ অবসরজীবন কাটাচ্ছেন।

প্রায় আড়াই মাস ধরে চলে চিকিৎসা। তারপর ১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই, এক ঝুমবৃষ্টির দিনে ফুলকলি আবার আলুটিলা পাহাড়ে যায়। কেউ জানত না, সেটাই হবে তার শেষ ভ্রমণ। হঠাৎ এক সময় সে বেখেয়ালে খাদে পড়ে যায়। সেখানেই তার করুণ মৃত্যু হয়।

পরে একটি ক্রেন এনে তাকে পাহাড় থেকে তোলা হয় এবং যথাযথভাবে তাকে সমাহিত করা হয়।

আজও খাগড়াছড়ির মানুষ স্মরণ করে সেই সহানুভূতির প্রতীক হাতিটিকে। ফুলকলি শুধুই এক পশু ছিল না—সে ছিল ভালোবাসার, দায়িত্বের, আর ইতিহাসের এক জীবন্ত চরিত্র।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

খাগড়াছড়ির ভালোবাসা: হাতি ‘ফুলকলি’র করুণ অধ্যায়

আপডেট সময় : ০৩:৪১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ মে ২০২৫

খাগড়াছড়ির ইতিহাসে ‘ফুলকলি’ এক অনন্য নাম। ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর মানবিকতার প্রতীক হয়ে থাকা এই হাতিটির গল্প শুনলে আজও চোখ ভিজে আসে পুরোনো খাগড়াছড়িবাসীর।

এই গল্পের শুরু প্রায় ৭৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের দিকে জন্ম নেওয়া ফুলকলি নামে হাতিটিকে ১৯৬২ সালে খাগড়াছড়ির তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম নিজের বাহন হিসেবে নিয়ে আসেন। সেসময় খাগড়াছড়ি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক প্রত্যন্ত মহকুমা, যেখানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথে চলাচলের একমাত্র নির্ভরতা হয়ে ওঠে ফুলকলি। প্রশাসকের যাতায়াতের বাহন হলেও, খুব অল্প সময়েই সে হয়ে ওঠে পুরো এলাকার মানুষের আপনজন।

গ্রামের মানুষের কাছে ফুলকলি ছিল স্নেহভাজন অতিথি। কেউ তাকে ডেকে আদর করত, কেউ খাওয়াত পাকা কলা, কাঁঠাল, ছোলা, গম আর কলাগাছ। ফুলকলির প্রতি মানুষের ভালোবাসা যেমন ছিল নিঃস্বার্থ, তেমনি ফুলকলিও গড়ে তোলে এক গভীর আত্মিক বন্ধন।

১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরিত হলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও দেখা যায় ফুলকলির সরব উপস্থিতি। সে সময় জেলা প্রশাসকেরা ফুলকলির পিঠে চড়ে বিভিন্ন স্থানে যেতেন। ধীরে ধীরে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ে, আর অবসর নিতে শুরু করে ফুলকলি। তবে রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে শহরের মাঠে অনুষ্ঠিত প্যারেডে ফুলকলি ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—সবাইকে সে অভিবাদন জানাত মাথা নত করে।

পাহাড়ি দুর্ঘটনায় আটকে পড়া যানবাহন উদ্ধারে ফুলকলির অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। খাদে পড়ে যাওয়া গাড়ি টেনে তোলার কাজটা সহজ করে তুলেছিল এই বিশাল প্রাণী। প্রতিদিন তার খাবারের তালিকাও ছিল বিশাল—এক ছড়ি পাকা কলা, পাঁচটি পাকা কাঁঠাল, পাঁচ কেজি ছোলা, পাঁচ কেজি গম, আর প্রতি তিন দিনে এক গাড়ি কলাগাছ।

তবে সব ভালোবাসার গল্পের মতো এ গল্পেরও এক বেদনার অধ্যায় রয়েছে।
একবার পাহাড়ে ঘুরতে গেলে ফুলকলির সামনে আসে একদল বুনো হাতি। তারা ফুলকলিকে দলে নিতে চায়, কিন্তু ফুলকলি যায় না। তার অবাধ্যতায় ক্ষিপ্ত হয়ে বুনো হাতিরা দলবেঁধে আক্রমণ করে। সেই আক্রমণে ফুলকলির বাঁ পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভেটেরিনারি চিকিৎসক আসেন তাকে বাঁচাতে। সে সময় ফুলকলির দেখাশোনায় ছিলেন শশী বিন্দু চাকমা নামের এক নিবেদিতপ্রাণ কম্পাউন্ডার, যিনি আজ অবসরজীবন কাটাচ্ছেন।

প্রায় আড়াই মাস ধরে চলে চিকিৎসা। তারপর ১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই, এক ঝুমবৃষ্টির দিনে ফুলকলি আবার আলুটিলা পাহাড়ে যায়। কেউ জানত না, সেটাই হবে তার শেষ ভ্রমণ। হঠাৎ এক সময় সে বেখেয়ালে খাদে পড়ে যায়। সেখানেই তার করুণ মৃত্যু হয়।

পরে একটি ক্রেন এনে তাকে পাহাড় থেকে তোলা হয় এবং যথাযথভাবে তাকে সমাহিত করা হয়।

আজও খাগড়াছড়ির মানুষ স্মরণ করে সেই সহানুভূতির প্রতীক হাতিটিকে। ফুলকলি শুধুই এক পশু ছিল না—সে ছিল ভালোবাসার, দায়িত্বের, আর ইতিহাসের এক জীবন্ত চরিত্র।