সর্বশেষ
শিবচর বাজারে গ্যাসের কৃত্রিম সংকট রোধে প্রশাসনের অভিযান। ৩৫ জেলায় নিপাহের মহাবিপদ: ইতিহাসে প্রথম অ-মৌসুমি সংক্রমণ, মৃত্যুহার ১০০%! জেএফ-১৭ থান্ডার ক্রয়ে বাংলাদেশ–পাকিস্তান আলোচনায় গতি, মিলছে প্রশিক্ষণ–সহায়তার আশ্বাস যুবলীগ নেতা বাপ্পির নির্দেশেই হাদি হত্যাকাণ্ড, অভিযোগপত্রে ডিবির চাঞ্চল্যকর তথ্য শেরপুরে বিএনপিতে যোগ দিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৩০০ নেতাকর্মী ফ্লাশ করলেই মিলবে কিডনি রোগের সংকেত: টয়লেট ট্যাবলেটে যুগান্তকারী উদ্ভাবন কারসাজিতে এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে: জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এনইআইআর ইস্যুতে রাজপথে উত্তাল মোবাইল ব্যবসায়ীরাপুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বৈঠকে যে কড়া বার্তা দিলেন আন্দোলনকারীরা সেন্টমার্টিন উপকূলে কোস্টগার্ডের অভিযানে মিয়ানমারে পাচারের সময় সিমেন্ট ও ডিজেলসহ ১৮ জন আটক কাফনের কাপড় পাঠিয়ে বিএনপি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি

ইসরায়েলি ষড়যন্ত্র ভেঙে পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার পথে পাকিস্তান: নেপথ্যে ছিলেন কাদির খান

প্রতিবাদী কণ্ঠ
  • আপডেট সময় : ০১:৫২:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫ ৩৯ বার পড়া হয়েছে


বিশ্ব রাজনীতির এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের নাম ড. আবদুল কাদির খান। যাকে পশ্চিমা গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছিল ‘বিপজ্জনক বিজ্ঞানী’ হিসেবে, তাকেই ২৫ কোটিরও বেশি পাকিস্তানি মনে করে জাতীয় বীর ও পরমাণু শক্তির রূপকার। তিনি শুধু পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর করেননি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ও এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে পরমাণু প্রযুক্তির বিস্তারেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

জায়নবাদী বাধা ও গুপ্তচক্রের বিরুদ্ধে একক লড়াই
১৯৭০ ও ৮০ দশকে যখন পাকিস্তান ধীরে ধীরে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছিল, তখন ইসরায়েল ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারেনি। একাধিকবার আবদুল কাদির খানকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এমনকি ইসরায়েল ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ছকও কষে। যদিও শেষপর্যন্ত ভারত সে পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।

ড. খান বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষায় পারমাণবিক শক্তি অপরিহার্য। বিশেষত প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন ১৯৭৪ সালে প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে—‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ নামে, তখন পাকিস্তানও সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য একই পথে এগোবে।

ভুট্টোর অঙ্গীকার, খানের বাস্তবায়ন
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণাই দিয়েছিলেন, “ঘাস খেয়ে হলেও আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করব।” তার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন ড. আবদুল কাদির খান। ১৯৩৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ভোপালে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী দেশভাগের পর পাকিস্তানে চলে যান এবং পরে ইউরোপে পড়াশোনা করে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে উচ্চদক্ষতা অর্জন করেন।

নেদারল্যান্ডসে কর্মরত অবস্থায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ গোপন নকশা তার হাতে আসে। পরে ১৯৭৬ সালে তিনি হঠাৎ দেশে ফিরে যান। তার ফেরার পেছনে ছিল পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ‘অপ্রত্যাখ্যেয়’ প্রস্তাব।

গোপনে গড়ে তোলা পরমাণু সাম্রাজ্য
রাওয়ালপিন্ডিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ল্যাবরেটরি—যেখানে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। সামরিক বাহিনীর পূর্ণ সহায়তায় এই কার্যক্রম এতটাই গোপনীয়ভাবে চলছিল যে বেসামরিক সরকারগুলোর বেশিরভাগই তা জানত না। কেবলমাত্র ভুট্টো ছিলেন সম্পূর্ণভাবে অবগত।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও ইরান ইস্যু
খান শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। লিবিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতেও পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিতে তিনি সহায়তা করেন। বলা হয়ে থাকে, তারই সহায়তায় উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এই কার্যক্রম কতটা গোপন ছিল তা বোঝা যায় বেনজির ভুট্টোর একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ সালে ইরান সফরে গিয়ে তিনি ইরানি প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির কাছ থেকে জানতে পারেন পারমাণবিক প্রযুক্তি আদান-প্রদান চুক্তির কথা। অথচ নিজ দেশেই তিনি এ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতেন না। তখনই প্রথমবারের মতো তার সামনে উন্মোচিত হয় কাদির খানের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নেটওয়ার্কের কথা।

অমরত্বের পথে এক বিজ্ঞানীর যাত্রা
২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন আবদুল কাদির খান। তবে তার কর্ম ও অবদান তাকে আজও পাকিস্তানের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে তিনি হয়তো ‘বিপজ্জনক’, কিন্তু পাকিস্তানিদের চোখে তিনি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক।

ইসরায়েলি বাধা, গোয়েন্দা চক্রান্ত ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও পাকিস্তানের পরমাণু যাত্রার স্থপতি হিসেবে আবদুল কাদির খানের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ইসরায়েলি ষড়যন্ত্র ভেঙে পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার পথে পাকিস্তান: নেপথ্যে ছিলেন কাদির খান

আপডেট সময় : ০১:৫২:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫


বিশ্ব রাজনীতির এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের নাম ড. আবদুল কাদির খান। যাকে পশ্চিমা গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছিল ‘বিপজ্জনক বিজ্ঞানী’ হিসেবে, তাকেই ২৫ কোটিরও বেশি পাকিস্তানি মনে করে জাতীয় বীর ও পরমাণু শক্তির রূপকার। তিনি শুধু পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর করেননি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ও এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে পরমাণু প্রযুক্তির বিস্তারেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

জায়নবাদী বাধা ও গুপ্তচক্রের বিরুদ্ধে একক লড়াই
১৯৭০ ও ৮০ দশকে যখন পাকিস্তান ধীরে ধীরে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছিল, তখন ইসরায়েল ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারেনি। একাধিকবার আবদুল কাদির খানকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এমনকি ইসরায়েল ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ছকও কষে। যদিও শেষপর্যন্ত ভারত সে পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।

ড. খান বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষায় পারমাণবিক শক্তি অপরিহার্য। বিশেষত প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন ১৯৭৪ সালে প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে—‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ নামে, তখন পাকিস্তানও সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য একই পথে এগোবে।

ভুট্টোর অঙ্গীকার, খানের বাস্তবায়ন
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণাই দিয়েছিলেন, “ঘাস খেয়ে হলেও আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করব।” তার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন ড. আবদুল কাদির খান। ১৯৩৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ভোপালে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী দেশভাগের পর পাকিস্তানে চলে যান এবং পরে ইউরোপে পড়াশোনা করে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে উচ্চদক্ষতা অর্জন করেন।

নেদারল্যান্ডসে কর্মরত অবস্থায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ গোপন নকশা তার হাতে আসে। পরে ১৯৭৬ সালে তিনি হঠাৎ দেশে ফিরে যান। তার ফেরার পেছনে ছিল পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ‘অপ্রত্যাখ্যেয়’ প্রস্তাব।

গোপনে গড়ে তোলা পরমাণু সাম্রাজ্য
রাওয়ালপিন্ডিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ল্যাবরেটরি—যেখানে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। সামরিক বাহিনীর পূর্ণ সহায়তায় এই কার্যক্রম এতটাই গোপনীয়ভাবে চলছিল যে বেসামরিক সরকারগুলোর বেশিরভাগই তা জানত না। কেবলমাত্র ভুট্টো ছিলেন সম্পূর্ণভাবে অবগত।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও ইরান ইস্যু
খান শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। লিবিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতেও পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিতে তিনি সহায়তা করেন। বলা হয়ে থাকে, তারই সহায়তায় উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এই কার্যক্রম কতটা গোপন ছিল তা বোঝা যায় বেনজির ভুট্টোর একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ সালে ইরান সফরে গিয়ে তিনি ইরানি প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির কাছ থেকে জানতে পারেন পারমাণবিক প্রযুক্তি আদান-প্রদান চুক্তির কথা। অথচ নিজ দেশেই তিনি এ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতেন না। তখনই প্রথমবারের মতো তার সামনে উন্মোচিত হয় কাদির খানের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নেটওয়ার্কের কথা।

অমরত্বের পথে এক বিজ্ঞানীর যাত্রা
২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন আবদুল কাদির খান। তবে তার কর্ম ও অবদান তাকে আজও পাকিস্তানের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে তিনি হয়তো ‘বিপজ্জনক’, কিন্তু পাকিস্তানিদের চোখে তিনি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক।

ইসরায়েলি বাধা, গোয়েন্দা চক্রান্ত ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও পাকিস্তানের পরমাণু যাত্রার স্থপতি হিসেবে আবদুল কাদির খানের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।