টেন্ডার, বদলি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তোলপাড় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
- আপডেট সময় : ০৩:৩৪:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
‘বিশেষ শর্তে’ কোটি টাকার দরপত্র, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া; শোকজের পরও বহাল অভিযুক্ত কর্মকর্তা?
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসছে। টেন্ডার কারসাজি, বদলি বাণিজ্য, মাসোহারা আদায়, প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজ বণ্টন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম—এসব অভিযোগে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার নদীবিধৌত চরাঞ্চলের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. আব্দুর রহিম।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ক্ষমতার পালাবদল হলেও অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমেনি। বরং প্রশাসনিক পরিবর্তনের আড়ালে পুরোনো স্বার্থগোষ্ঠী নতুন কৌশলে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের তৎকালীন এপিএস হিল্টন কুমার সাহার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দরপত্র ও প্রকল্প কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন ডা. আব্দুর রহিম।
দরপত্রে ‘বিশেষ শর্ত’, সুবিধা কার?
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সরকারি খামারের জন্য গবাদিপশুর খাদ্য ক্রয়ের দরপত্রে এমন কিছু শর্ত সংযোজন করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব শর্তের ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়া কার্যত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
সূত্রগুলো দাবি করছে, এসব শর্তের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী আমলের প্রভাবশালী ঠিকাদার হিল্টন কুমার সাহার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়ে আসছে।
৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট উপহারের অভিযোগ
প্রকল্প পরিচালক ডা. আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট গ্রহণের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঠিকাদার হিল্টন কুমার সাহার কাছ থেকে ওই ফ্ল্যাট উপহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
যদিও অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও পেশাজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—সরকারি প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের এমন সম্পর্ক কতটা স্বচ্ছ ও নৈতিক?
শোকজ, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
অভিযোগের প্রেক্ষাপটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত ৭ জুন ডা. আব্দুর রহিমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এটিকে যথেষ্ট মনে করছেন না। তাদের ভাষ্য, গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
বদলি বাণিজ্য ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ
টেন্ডার অনিয়মের পাশাপাশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় এবং এ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত আর্থিক লেনদেন হয়।
এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে, যা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন
নদীবিধৌত চরাঞ্চলের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিতরণ করা হাঁস, মুরগি, ছাগল ও ভেড়ার প্রকৃত অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বিতরণ দেখানো হলেও বাস্তবে উপকারভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাননি। কোথাও বিতরণ করা প্রাণী মারা গেছে, আবার কোথাও প্রকল্পের সফলতা দেখাতে শুধু ছবি তোলার অভিযোগও রয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. আব্দুর রহিমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে উত্থাপিত এসব অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক শোকজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
























